নিজস্ব প্রতিবেদক
গত ১৬ মার্চ ২০২৫, জামালপুর: নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং প্রতি সকল ধরণের সহিংসতা বন্ধ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের দাবি জানিয়েছে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), জামালপুর। আজ ১৬ মার্চ ২০২৫ তারিখ শহরের দয়ামীয় মোড়ে আয়োজিত এক মানববন্ধনে উক্ত দাবি জানানো হয়। সনাক সভাপতি শামিমা খান এর সভাপতিত্বে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সাম্প্রতিক সময়ে সংঘঠিত ধর্ষণ ও সহিংসতা প্রতিরোধে মানববন্ধন থেকে সনাক ও টিআইবি’র ১১ দফা করণীয় উপস্থাপন করা হয়।
সনাক সভাপতি শামিমা খান বলেন, বাংলাদেশে দুর্নীতির কারণে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে, ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি মৌলিক অধিকার পরিপন্থীও। তিনি বলেন, টেকশই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন করতে হলে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। নারীর অধিকার নিশ্চিতে সামাজিক ও সাংস্কৃতির আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো জামালপুরেও নারী ও শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অভূতপূর্ব রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে সূচিত বৈষম্যবিরোধী নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে নারী ও শিশুর প্রতি সকল ধরণের সহিংসতা অন্তরায়। নারীকে সহিংসতা থেকে সুরক্ষিত রাখতে না পারলে নারীর ক্ষমতায়ন বা সমতা অর্জনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে ও বিভিন্ন কার্যকর প্রচারণামূলক কার্যক্রম গ্রহন করতে হবে। বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে নারীর নিরপত্তা বিধানে সবাইকে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে।
মানববন্ধনের শুরুতে সনাক সদস্য অধ্যাপক কায়েদ-উয-জামান এর উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। সনাক জামালপুরের ইয়েস সহদলনেতা আবিদা সুলতানা রুমা মানববন্ধনে টিআইবি প্রস্তাবিত নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ১১ দফা করণীয় উপস্থাপন করেন। (১) বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও “নতুন বাংলাদেশ”- এর মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং সব ধরনের যৌন নির্যাতন, সহিংসতা ও বৈষম্য প্রতিহত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং এসব অপরাধের সাথে জড়িতদের দ্রæততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি অপরাধের শিকার পরিবারকে সকল প্রকার সহায়তা প্রদান করা। (২) সকল ক্ষেত্রে ও পর্যায়ে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা এবং এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার ও বিদ্যমান আইনসমূহের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। (৩) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রসহ সকল পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে নারীর নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা। (৪)সকল রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠন, পেশাজীবী সংস্থা, সকল প্রকার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নারীপুরুষের সমঅধিকার ও সমমর্যাদার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ঘোষণাসহ চর্চা প্রতিষ্ঠার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। (৫) টেকসই উন্নয়ন অর্জনের কর্মপরিকল্পনায় অভীষ্ট-৫ (জেন্ডার সমতা) ও ১৬ (শান্তি, ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান) কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন বন্ধের পূর্বশর্ত হিসেবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণসহ আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা ও নানা অজুহাতে যত্রতত্র হেনস্থা রোধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন। (৬) নারী ও শিশু নির্যাতনসহ সকল প্রকার নারী অধিকার হরণের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠানকে Ñ বিশেষ করে প্রশাসন, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি প্রতিরোধ, শুদ্ধাচার, জবাবদিহিতা ও সার্বিক সুশাসন নিশ্চিত করা। (৭) জেন্ডার সমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে নারীর অভিগম্যতা নিশ্চিত, ইন্টারনেট ও প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস সুলভ করা এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অনলাইনে সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিতে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ বিশেষায়িত জাতীয় কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। (৮) যে সকল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাঙ্গনে বা সমাজে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ্যে কাজ করছেনÑতাদের উৎসাহিত, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও সুরক্ষা প্রদান করা। (৯) মহামান্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে সকল প্রতিষ্ঠানে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখার নিশ্চয়তাসহ নারীবান্ধব অভিযোগ প্রদান ও নিরসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে; নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি বন্ধে ব্যক্তির রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থান, মর্যাদা ও প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রæত বিচার নিষ্পত্তি করা। (১০) নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ ও নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিতে সাধারণ জনগণের ইতিবাচক মানসিকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কার্যকর প্রচারমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা। (১১) জাতীয় হেল্পলাইন ও অভিযোগ জানানোর হটলাইন নম্বরগুলোর প্রচার ও কার্যকরতা বৃদ্ধি।
সনাক সহসভাপতি এ কে এম আশরাফুজ্জামান-এর সঞ্চালনায় সভায় আরো বক্তব্য প্রদান করেন জামালপুর জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এম.এ. জলিল, পরিবেশ বাঁ”াও জামালপুরের সাধারন সম্পাদক এড. ইউসুফ আলী, উদিচির সহসভাপতি গৌতম সিংহ সাহা, কনজুমার এসোসিয়েশন বাংলাদেশ জামালপুরের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী আকবর ফকির, দুর্বার নারী নেটওয়ার্কের ময়মনসিংহ অঞ্চলের সভানেত্রী সাজেদা পারভীন ঝিনুক, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের চেঞ্জ মেকার রিনা আক্তার, সনাক সদস্য রফিকুজ্জামান মল্লিকসহ প্রমূখ। মানববন্ধনে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, সাধারণ জনগন ও সাংবাদিক উপস্থিত থেকে উত্থাপিত দাবীর সাথে একাত্বতা প্রকাশ করেন।
(মো: আরিফ হোসেন)
এরিয়া কো-অর্ডিনেটর
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), জামালপুর
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)